ভয় বা পেরেশানি দূর করার আমল
ভয় বা পেরেশানি দূর করার আমল
মানুষ হিসেবে আমি অনেক সাহসী কিন্তু সাঙ্গাতিক রকমের ভয় কাতর, খুব অল্পতেই ভয় পেয়ে যাই কিন্তু যখন বুঝতে পারি ভয় পাচ্ছি ঠিক তখনই সাহসে ঘাড় সোজা করে দাঁড়িয়ে বলি, আয়....কে আসবি?
ভয় দূর করার জন্য কিছু আমল নিয়মিত করলে ইনশাআল্লাহ ভয় থাকবেনা আপনার জীবনে।
এক-চুরি, ছিনতাই বা ডাকাতের ভয় হলে-
2002 সালে ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে আমার ভাগিনার সাথে চট্টগ্রাম গেলাম। চট্টগ্রাম পৌছতে পৌছতে রাত 10 টা। ভাগিনার হাতে কুমিল্লার রস মলাই। ওর এক আত্মীয়ের অনুরোধে কুমিল্লা থেকে নিয়েছে এখন তাদের বাসায় পৌছে দিতে হবে। ওনাদের বাসায় যাওয়ার পর কুশলাদি বিনিময়, গল্প ও রাতের খাবার শেষ করতে রাত প্রায় 11.30, ওর আত্মীয় খুবই আন্তরিক মানুষ কিন্তু বাসায় দুইজন ছেলে মেহমান ঘুমাতে দেবার মতো জায়গা না থাকায় আন্তরিক ভাবে বলল, কিছু মনে করোনা, শহরে খাওয়ানো যায় কিন্তু ঘুমাতে দেওয়া যায়না। আমাদের ঘুমানোর জায়গা খুবই কম আর না হয় এতো রাতে যেতে দিতাম না। আমার ভাগিনা বলল, সমস্যা নেই আমরা যেতে পারব। সে আগে থেকেই চিটাগং থাকে তাই তার কোন সমস্যা নেই কিন্তু নতুন হিসেবে আমার ভেতর ভয় কাজ করছে। ওর আত্মীয় হয়তো বিষয়টা আন্দাজ করতে পেরেছেন, তিনি বললেন, ব্যাপার না। আমার গাঁয়ে অনেক বেশি অলংকার থাকা অবস্থায় রাস্তা দিয় হাঁটলে যখন ছিনতাই বা ডাকাতির আশঙ্কা করি তখন মনে মনে ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, ইয়া রাসুলুল্লাহ' পড়তে থাকি। আলহামদুলিল্লাহ, আজ পর্যন্ত আমার কোন সমস্যা হয়নি।
তোমরা ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, ইয়া রাসুলুল্লাহ'’ পড়তে পড়তে চলে যাবে।
এই আমলটি আমি করেছি, চমৎকার কাজ দেয়। তার মানে আপনি ছিনতাই, ডাকাতি বা এই জাতীয় বিপদের আশঙ্কায় এই আমলটি করতে পারেন ভক্তিভরে।
2. সমাজে, কর্মস্থলে ইজ্জত সম্মান বৃদ্ধির আমল-
আপনি যদি আপনার কর্মস্থল বা বসবাসরত সমাজে ইজ্জত সম্মান নিয়ে ভয়ে থাকেন, আপনি চান ইজ্জত সম্মান না কমে আরো বৃদ্ধি পাক তাহলে এই আমলটি করতে পারেন-
বিসমিল্লাহ সহকারে ’ফাবিআইয়ি আ-লাই রাব্বিকুমা-তুকাযযিবা-ন।’
অফিসে যাওয়ার পূর্বে বা ঐ সমাজে যাওয়ার পূবে নিয়মিত ভাবে তিনবার ”ফাবিআইয়ি আ-লাই রাব্বিকুমা-তুকাযযিবা-ন ” পড়ে বুকে ফু দিবেন আর সম্ভব হলে দুই হাতের তালুতে ফু দিয়ে মুখ ও মাথায় হাত বুলিয়ে নিবেন।
এইটাও একটি পরীক্ষিত আমল।
3. ইন্টারভিউ বা কারো সাথে সাক্ষাৎকারে বিজয়ী হতে চাইলে-
চাকুরির ইন্টারভিউ বা অন্য কোন কোন ইন্টারভিউ তে যাবেন, ভয়ে আপনার বুক দুরু দুরু করছে, বিসমিল্লাহ সহকারে 'ইয়া মুকাদ্দিমু, ইয়া মুকাদ্দিমু, ইয়া মুকাদ্দিমু'
পড়ুন যতো বেশি সম্ভব হয়। ইন্টারভিউর রুমে প্রবেশের সময় অবশ্যই এই দুরুদ পড়তে পড়তে প্রবেশ করবেন, ইনশাআল্লাহ ভালো ফল পাবেন।
4. যেই কোন বিপদ বা প্রতিকূল অবস্থায় নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে অব্যর্থ একটি আমল-
ক. আমার স্ত্রী ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাসে সার্টিফিকেট কোর্স পরীক্ষা দিবে, সঙ্গত কারনেই ওর শিক্ষাগত যোগ্যতার সকল মূল সনদ ভিক্টোরিয়া কলেজে জমা দিতে হলো। ঘটনাচক্রে ওর রেজিস্ট্রেশনের সময় ‘ইসলামের ইতিহাস না হয়ে ইসলামিক স্টাডিজ হয়ে গেছে’ এই ভুল কারেকশন এর ফি আর মূল সনদগুলো ফেরত আনতে গেলাম, দায়িত্বরত পরিচিত ভাইটি অনেক বেশি টাকা কারেকশন ফি ও সনদ উত্তোলন বাবদ দাবি করলেন। ওনার দাবিকৃত টাকার পরিমান শুনে দ্বিতীয়বার ওনাকে এইগুলো ফেরত দেওয়ার কথা না বলে ফেরত চলে আসি।
কিছুদিন পর এই আমলটি করতে করতে ওনার কাছে গেলাম, সালাম দিয়ে বললাম, ভাই আমার স্ত্রীর কাগজপত্রগুলো যদি দিতেন। মনে রাখবেন এই আমলটি করা অবস্থায় যে আপনার ভয়ের কারন, যার দ্বারা আপনার অন্যায় ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মনে মনে আমলটি করবেন, সম্ভব হলে আয়াতে কারিমা পড়ে আস্তে করে তার দিকে ফুঁ দিবেন, ইনশাআল্লাহ আপনি কখনই অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবেন না।
কাজের চাপ কাগজপত্র ফেরত দেওয়ার কথা ঐ ভাইটি ভুলে গেলেন, আমি পুনরায় নাম ধরে বললাম, ভাই আমার কাগজগুলো....। ওনি একজনকে একাধিকবার নাম ধরে ডাকলেন কিন্তু ঐ লোক সাড়া দেয় নাই। এক পর্যায়ে ওনি ওঠে গিয়ে জমাকৃত ফাইল ঘেঁটে আমার স্ত্রীর সকল কাগজপত্র বের করে দিলেন, কারেকশনের করে দিয়েছেন সেইটাও বললেন কিন্তু কোন টাকা পয়সা দাবী করলেন না।
আমি নিজ থেকে বললাম, ভাই, এখানে আপনার কোন খরচ আছে কি? ওনি বললেন, না, না। কোন খরচ নেই, আপনি যান। আমি দ্রুত পকেটে হাত ঢুকিয়ে দুইশত টাকা বের করে ওনার হাতে দিয়ে বললাম, এইটা দিয়ে নাস্তা পানি খাবেন, ওনি খুশি মনে আমাকে বিদায় দিলেন।
আয়াতটি হচ্ছে-
"হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকিল, "ফানি'মাল মাওলা ওয়া নি'মান নাসির"
এই আমলের ব্যাপারে কিছু দলিল দিচ্ছি-
দুনিয়ার যাবতীয় ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকতে এবং যাবতীয় পরীক্ষায় পাস করতে পবিত্র কুরআনের দুটি আয়াতাংশের সমন্বয়ে একটি উত্তম তাসবিহ তথা দোয়া রয়েছে। যা সফলতা লাভে অত্যন্ত কার্যকরী। দোয়াটি হলো-
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
"হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকিল, অর্থঃ আল্লাহ্ আমাদের জন্য যথেষ্ট ও তিনি অতি উত্তম রক্ষাকর্তা । (আল ইমরান - ১৭৩)
فَنِعۡمَ الۡمَوۡلٰی وَ نِعۡمَ النَّصِیۡرُ
"ফানি'মাল মাওলা ওয়া নি'মান নাসির" অর্থঃ কতো উত্তম অভিভাবক এবং কতো উত্তম সাহায্যকারী তিনি!” (আল হজ্জ -৭৮)
প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, দুঃশ্চিন্তা ও পেরেশানীতে আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে এ দোয়া পড়ার জন্য তাঁর উম্মতদেরকে উৎসাহিত করেছেন।
মহান আল্লাহ তাআলাই সেই মহান সত্তা; তিনি যদি কাউকে বিপদ দিতে চান তা রোধ করার কোনো শক্তি কারো নেই। আবার কাউকে যদি তিনি কল্যাণ দিতে চান তাতে বাধা দেয়ার সাধ্যও কারো নেই। তাই আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে এবং তাঁর সাহায্য লাভে এ দোয়াটিই সর্বোত্তম।
সুতরাং বিপদ-আপদ-মুসিবতে আল্লাহর শেখানো শব্দমালা দ্বারাই তাঁর কাছে সাহায্য কামনা করা উত্তম। যেহেতু আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে তাঁরই তাসবিহ-তাহলিল ও তাওবা-ইসতেগফারের বিকল্প নেই।
উল্লেখ্য যে, হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এ দোয়ার প্রথমাংশ পড়ে নমরূদের অগ্নিকুণ্ডলি থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে যখন অবিশ্বাসী অত্যাচারী নমরূদ অগ্নিতে নিক্ষেপ করেন তখন তিনি ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল’ পড়েন। যার ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে নমরূদে অগ্নিকুণ্ডলী থেকে রক্ষা করেছিলেন।
আবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন শুনলেন যে, মুশরিকরা তাঁর ওপর আক্রমণ করবে তখন তিনি এ খবর পাওয়া মাত্রই ‘হামরাউল আসাদ’ নামক স্থানে এ দোয়াটি পড়েন। (বুখারি)
বি.দ্র. অবৈধ কিছু হাসিল করার উদ্দেশ্যে এই আমলটি না করাই ভালো।
পাঁচ-জ্বিন-ভূতের ভয়
কিছুদিন পূর্বের ঘটনা, আমার উকিল দাদী ফোন করলেন এখনই যেনো তাদের বাসায় যাই। রাত তখন আটটা বেঁজে বত্রিশ।
যেতে মন চাইছিলনা।
ওনার আলোচনার বিষয়টা জরুরি তাই অনিচ্ছাসত্বেও গেলাম।
প্রয়োজনীয় কথা, রাতের খাবার শেষ করে বাসায় ফিরব এমন সময় ওনি একটি ব্যাগ হাতে দিলেন।
আমি বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করলাম, কি আছে এই ব্যাগে?
কয়েক পদের পিঠা;
পিঠা বানানোর জন্য চাউল।
অনিচ্ছাসত্বেও ব্যাগ হাতে নিয়ে রওয়ানা দিলাম।
গাঢ় অন্ধকার রাতে ব্যাগ হাতে নিয়ে হাঁটছি।
ওনাদের বাড়ি থেকে কিছুটা পার হলেই একটা ঈদগাঁহ।
আমার মনে পড়ল ঈদগাঁহের পশ্চিম পাশে একটি কবরস্থান আছে। এই গাঢ় অন্ধকারে কবরের পাশ দিয়ে যেতে কেমন লাগবে ভাবতে ভাবতেই কবরস্থানের কাছাকাছি চলে আসছি।
নিস্তদ্ধ অন্ধকার ভেদ করে একটি শব্দ কানে আসল, মিয়াউ!
ভয় আর আতঙ্কে আমি চিৎকার করতে যাবো এই সময় আমার ভেতর থেকে বলে উঠল, কবির, ঘুরে দাঁড়া।
মোবাইলের আলো জ্বেলে দেখলাম আমার পাশেই একটি কালো বিড়াল।সাথে সাথে পেছনের দিকে ফিরে দাড়িয়ে বললাম, কে? আয় দেখি?
বিড়ালটিকে আর দেখতে পেলামনা। আমার ভেতরের ভয় দূর করার জন্য আরো কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে পরিস্থিত পর্যবেক্ষণ করে সামনে হাঁটা শুরু করলাম।
একা ঘরে ঘুমালে, গভীর রাতে নামাজ পড়লে অথবা মোরাকাবা করলে আমাদের অনেকের মধ্যেই ভয় কাজ করে।
কোন কোন সময় দেখা যায় ছোট বাচ্চারা ঘুমের মধ্যে চিৎকার দিয়ে ওঠে।
কিছু ছোট আমল এই ভয়গুলো থেকে আমাদেরকে পরিত্রাণ দিতে পারেন। আমার লিখা পড়ে এইটার বিরুদ্ধে লেগে যাওয়ার দরকার নেই? আমার থেকে ভালো কোন পদ্ধতি আপনার জানা থাকতেই পারে, মন্তব্যের ঘরে লিখলে উপকৃত হবো আশা করছি।
প্রথম পদ্ধতি হচ্ছে চার কুল পড়ে শরীর বা ঘর বন্ধ করা।
একা ঘরে ঘুমালে, গভীর রাতে বা একা নামাজ পড়ার সময় কিংবা মোরাকাবার সময় অথবা বাচ্চাদের শরীর বন্ধ করার ক্ষেত্রে-
1. বিসমিল্লাহ সহকারে সূরা নাস পড়ে ডান কাঁধে ফু;
2. বিসমিল্লাহ সহকারে সূরা ফালাক্ব পড়ে বাম কাঁধে ফু;
3. বিসমিল্লাহ সহকারে সূরা ইখলাস পড়ে বুকে ফু;
4. বিসমিল্লাহ সহকারে সূরা কাফিরুন পড়ে কপালে ফু। কপালে ফু দিতে না পারলে দুই হাতের তালুতে ফু দিয়ে মুখ ও মাথায় হাত মুছে নেই।
ঠিক এই চার কুল দিয়ে শরীর বন্ধ করতে চাইলে-
বিসমিল্লাহ সহকারে সূরা নাস পড়ে ঘরের ডান কোনা থেকে শুরু করে পেছন, বাম ও মাথার দিকের চার কোনার দিকে চারটি ফু দিয়ে ঘুমাই। ফলাফল, আলহামদুলিল্লাহ অত্যন্ত ভালো।
দ্বিতীয় পদ্ধতি হচ্ছে সূরা কুরাইশ পড়ে শরীর বা ঘর বন্ধ করা।
শরীর বন্ধ করতে চাইলে বিসমিল্লাহ সহকারে সূরা কুরাইশ পড়ে ডান কাঁধ, বাধ কাঁধ, বুক ও মাথার দিক চার বার পড়ে চারটি ফু দিয়ে ঘুমাই। আর ঘর বন্ধ করতে গেলে
বিসমিল্লাহ সহকারে সূরা কুরাইশ পড়ে আপনি ঘরে যেই অবস্থায় আছেন সেই অবস্থায় ডান কোনার দিকে একটি ফু, এইভাবে চারবার পড়ে বামে দিকে ঘুরিয়ে চার কোনায় চারটি ফু দিয়ে তিনবার শব্দ করে গলা ঝাড়া বা খেকরানি দিবেন। আপনার গলার স্বর যেইটুকু পর্যন্ত ব্যাপ্তি হবে সেইটুকু পর্যন্ত জিন বা ভূত কিছুই আসবেনা। (এই শেষ পদ্ধতিটি কিছুদিন আগে এক দ্বীনি ভাইয়ের কাছ থেকে জেনেছি, এটাও বেশ কার্যকর)
মজার বিষয় হচ্ছে যদি ঘুমের মধ্যে কাউকে বোবায় ধরে তাহলেও সূরা কুরাইশ এর আমল করলে খুব ভালো ফল পাওয়া যায়।
আসলে বনের বাঘের চেয়ে মনের বাঘই হিংস্র বেশি। আমাকে বার বার মনের বাঘে খায়। যদি কেউ মনের বাঘের সাথে যুদ্ধ করে টিকে যান তাহলে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবেন কিন্তু এই টিকে যাওয়াটাই বেশ চ্যালেঞ্জিং।
সংকলক: মো: কবির খান বিপ্লব
