স্মৃতিময় দিনগুলি
গল্পের নাম: স্মৃতিময় দিনগুলি
শিরোণাম: কালী নারায়ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রথম দিন
আমি কিন্তু কিছু টাকা পাই।
জাকিয়া আপার নিকট। সেই টাকা তিনি আর ফেরত দেন নাই। ফেরত দিলেই যে আমি নিয়ে নিব বিষয়টা এমনও নয়। কিছু ঋণ রেখে দিতে হয়, রেখে দেওয়ার মাঝেই আনন্দ।
মোমবাতি অথবা বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বলে এবং আলো দেয় কিন্তু সেই মোমবাতি কিংবা বৈদ্যুতিক বাল্ব কে আগে কেউ জ্বলতে সহযোগিতা করতে হয়, জাকিয়া ফেরদৌসী ম্যাডাম তেমন জ্বালিয়ে দেওয়া এক নারী।
তাঁর কথায় মোমবাতি বা বৈদ্যুতিক বাল্ব না জ্বললেইও মানুষের হৃদয় জ্বলে; অনুপ্রেরণার বহ্নিশিখায়।
২৭ মার্চ ২০১১ তারিখে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার লক্ষ্যে নিয়োগ-নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য বুড়িচং কালী নারায়ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যাই। সময় তখন সকাল ৯:৩০ এর একটু বেশি।
আমি, বাকশীমূল মাদ্রাসার আইসিটি শিক্ষক মো: জাকির হোসেন, ছয়গ্রাম মাদ্রাসার আইসিটি শিক্ষক মোহাম্মদ মনির হোসেন স্যার স্কুলের উত্তর দিকের গেইটে দাঁড়িয়ে কথা বলছি এমন সময় একটি রিক্সায় চেপে এসে একজন ম্যাডাম নামলেন কিন্তু ওনার কাছে ভাংতি টাকা ছিলনা, রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া দেওয়ার জন্য ওনি সাত/পাঁচ না ভেবেই জিজ্ঞেস করলেন, এই তোমাদের কারো কাছে কি দশ টাকা আছে?
আমি দশ টাকার একটি নোট ওনাকে দিলাম, ওনি ভাড়া মিটিয়ে দিলেন।
জানতে পারলাম, ওনি জাকিয়া ম্যাডাম। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে দশ টাকা ফেরত দিতে চাইলেন কিন্তু আমি বললাম, না। লাগবে না।
ওনি ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে গেলেন।
সম্পাদক: জনাব সাইফুল আজিজ, কথা সাহিত্যিক
শিরোণাম: নিয়োগ নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ
শুনলাম দশটার দিকেই নিয়োগবোর্ডের সদস্যগণ স্কুলে এসে উপস্থিত হয়েছেন এবং প্রশ্ন করা শুরু করেছেন।
প্রশ্ন করা শেষ হলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ডাক পড়ল।
সকাল ১১ টার সময় পরীক্ষা শুরু হলো। মোট প্রতিযোগী ছিলাম এগারো জন। স্কুলের উত্তর ভিটের দু'তলা ভবনের পূর্ব দিকের ল্যাবের পাশের রুমে আমাদের পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো।
কক্ষ পর্যবেক্ষক ছিলেন Z.M. Mizanur Rahman Khan sir (জনাব জেড এম মিজানুর রহমান খান), উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা, বুড়িচং। অনিয়মিত পর্যবেক্ষক হিসেবে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন বুড়িচং আনন্দ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জনাব জাহাঙ্গীর আলম, কুমিল্লা কমার্স কলেজের কম্পিউটার শিক্ষক, বিদ্যালয়ের সভাপতি জনাব বিষ্ণু কুমার ভট্টাচার্য্য, প্রধান শিক্ষক জনাব ফিরোজা বেগমসহ বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার অন্যান্য সদস্যগণ।
লিখিত পরীক্ষা শেষ হলে উনারা উত্তরপত্র মূল্যায়ন শুরু করলেন আর আমাদের শুরু হলো অপেক্ষার পালা। কিছু গুঞ্জন শুনলাম, টাকই থেকে আসা আবুল কালাম আজাদ বা জগতপুরের বিলকিছ নামের দুইজন প্রার্থীর নাম আলোচনায় আসলো; চিন্তা করলাম, অপেক্ষা করব নাকি চলে যাব?
ব্যবহারিক পরীক্ষা শুরু হলো। সবাই ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেন। আমার ব্যবহারিক পরীক্ষার উত্তরপত্রটি প্রিন্ট করতে গিয়ে দেখা গেল কাগজ রেখে প্রিন্ট করার জন্য পেপার ট্রে নাই। ব্যবহারিকের পরীক্ষক জনাব জেড এম মিজানুর রহমান খান স্যার বললেন, আমি কাগজটা ধরছি আপনি প্রিন্ট দিন, আমি বললাম, না। আমিই প্রিন্ট করে দিচ্ছি। আমি কীবোর্ড থেকে ctrl+p চেপে কাগজটা বাম হাতে ধরে ডান হাতে এন্টার কী চাপলাম উত্তরপত্র প্রিন্ট হল, স্যার আমার স্বাক্ষর নিয়ে চলে গেলেন। তবে আমার প্রিন্ট কমান্ড দেওয়ার ধরন দেখে ওনার চেহারায় যেইটা দেখলাম সেইটাতে আমি বুঝতে পারলাম ঘটনা এগুবে বহুদূর...।
দুপুরের লাঞ্চ ওখানেই করালেন। সাক্ষাৎকারের জন্য তিনজনকে রেখে বাকিদের বিদায় দিয়ে শুরু হলো সাক্ষাৎকার। প্রাথী হিসেবে আমি ছিলাম তিন নম্বর সাক্ষাৎকারপ্রার্থী।
অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলাম। সালাম দিয়ে এগিয়ে গেলাম টেবিলের কাছাকাছি যার চারপাশে সবাই বসে আছেন। সাক্ষাৎকারপ্রার্থীর জন্য রাখা চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে অনুমতি নিয়ে বসলাম এবং প্রশ্ন শুরু হলো-
কেমন আছেন?
আলহামদুলিল্লাহ, ভাল আছি।
কুমিল্লা থেকে আসা স্পেশালিস্ট: পরীক্ষা কেমন হয়েছে?
: জ্বী, আলহামদুলিল্লাহ ভাল হয়েছে।
কুমিল্লা থেকে আসা স্পেশালিস্ট: ব্যবহারিক পরীক্ষায় কোন ভুল হয়েছে?
: জ্বি না। কোন ভুল হয় নাই।
কুমিল্লা থেকে আসা স্পেশালিস্ট: ব্যবহারিকের উত্তর লেখার ডকুমেন্ট কি নামে সেভ করেছেন?
: দু:খিত, কোন নির্দিষ্ট নামে সেভ করি নাই।
কুমিল্লা থেকে আসা স্পেশালিস্ট: কেন করেন নাই?
ডকুমেন্টে দ্রুত কাজ করতে গেলে বাম হাতের কমান্ড প্রয়োগে এইগুলো নিজের অজান্তেই হয়ে যায়।
কুমিল্লা থেকে আসা স্পেশালিস্ট: কম্পিউটারে ডিজাইন করতে গেলে কোন প্রোগ্রাম ব্যবহার করতে হয়?
: ফটোশপ।
ওনার প্রশ্ন করার ফাঁকে অন্যান্য সদস্যগণ প্রশ্ন করেন আমি ওনাদেরকেও উত্তর দেই। কিন্তু কুমিল্লা থেকে আসা স্পেশালিস্টের প্রশ্নের বাণে আমি যেমন জর্জরিত তেমনই নিয়োগবোর্ডের অন্যান্য সদস্যগণও বিরক্ত; এইটা ওনাদের অভিব্যক্তি দেখেই বুঝতে পারলাম।
বোর্ডের অন্যান্য সদস্যগণ প্রশ্ন করা শেষ এখন ওনাকে বলছেন, চলবে, এবার থামুন। ওনি থামলেন আমাকে আরো একটি প্রশ্ন করে। ওনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘কম্পিউটার তাহলে আপনি পারেন?’
আমি উত্তর দিলাম, হ্যাঁ, কম্পিউটার আমি পারি।
সভাপতি মহোদয় প্রশ্ন করলেন, এতো ভাল কম্পিউটার জানেন, আপনি শিক্ষকতায় আসবেন কেন?
: হোম সিক, আমি খুব হোম সিক মানুষ, তাই এলাকায় চলে আসতে চাই।
: আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি আসুন।
আমি সালাম দিয়ে বের হয়ে এলাম।
চলে আসার সময় আমাকে পুনরায় ডেকে নেওয়া হলো, আমি সালাম দিয়ে রুমে প্রবেশ করলাম।
আপনি কি সত্যিই স্কুলে শিক্ষকতা করবেন?
জ্বী, করব।
আপনি তিনশত টাকার স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিতে পারবেন যে, আগামী পাঁচ বছর আপনি এই স্কুলে চাকরি করবেন?
: জ্বী, স্বাক্ষর দিতে পারব।
: ঠিক আছে তাহলে আসুন।
চলে আসার সময় পুনরায় ডাক আসল, আবারো সালাম দিয়ে রুমে প্রবেশ করলাম।
:শুনেন, আপনার সকল সার্টিফিকেট আমাদের নিকট জমা দিয়ে দিবেন। আগামী পাঁচ বছর এইগুলো আমাদের কাছে থাকবে।
আমি বললাম, আচ্ছা, দিব।
: আর শুনেন, আপনাকে কথা দিতে হবে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আপনি ভরাসার, আরাগ, মডেল ও পূর্ণমতি উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতে পারবেন না।
আমি বললাম, যাব না।
ঊনত্রিশ তারিখে নিয়োগপত্র হাতে পেলাম, প্রধান শিক্ষক ফোন দিয়ে বললেন, এই ব্যাপারে আমি দেরি করতে চাইনা, তুমি একত্রিশ তারিখেই যোগদান করে ফেলো, আমি বললাম, আচ্ছা।
এই সময়ের মধ্যে মোর্শেদা বেগম উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক আসলেন, উনি বললেন, আপনি আমার আপনজন। আমার হেড স্যার আপনার ব্যাপারে শুনে বলেছেন আপনাকে যেনো ধরে নিয়ে যাই। আপনাকে আমাদের এখানে চাকরি করতে হবে।
সাদকপুর বালিকা মাদ্রাসার শ্রদ্ধেয় হামিম স্যার বহুদিন আমাকে সময় দিয়েছেন, আমি যেনো ওনার সাথে রাজি হই এবং ঐ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করি।
আমার মেঝো ভাই বললেন, যদি শিক্ষকতা করো তাহলে কালী নারায়ণেই করো আর না হয় ঢাকার চাকরিতে ফিরে যাও, শিক্ষকতা করা লাগবে না।
আমি মহান আল্লাহপাকের নাম নিয়ে ৩১-৩-২০১১ তারিখে বুড়িচং কালী নারায়ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (আইসিটি) হিসেবে যোগদান করলাম।
সম্পাদক: জনাব সাইফুল আজিজ, কথা সাহিত্যিক
শিরোণাম: শিক্ষক হিসেবে যোগদান
প্রধান শিক্ষিকার পরামর্শ মতো ৩১-৩-২০১১ খ্রি. তারিখ বৃহস্পতিবার যোগদানপত্র নিয়ে সকাল নয়টা ত্রিশ মিনিটের পূর্বেই বিদ্যালয়ে হাজির হলাম।
এই সময়ের মধ্যে স্কুলে আসা প্রায় সকল শিক্ষকই প্রধান শিক্ষিকার কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। প্রধান শিক্ষিকার টেবিলের সামনে রাখা তিন সারি চেয়ারের মাঝের সারিতে আমি বসলাম। যোগদানপত্র গ্রহণের সময় আমাকে সামনের সারিতে উত্তর দিক থেকে দ্বিতীয় চেয়ারে বসার সুযোগ করে দিলেন। উত্তর দিকের চেয়ারে জনাব মো: সিরাজুল ইসলাম ভূঞা স্যার বসা ছিলেন আর ওনার পাশেই আমি বসলাম। যোগদানপত্র গ্রহণ ও সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের মাধ্যমে এই পর্বের শেষ হলে সিরাজ স্যারের উপরে দায়িত্ব পড়ল আমার পরবর্তী করণীয় ঠিক করে দেওয়ার।
শিক্ষক মিলনায়তনে গিয়ে বসলাম, কেউ এসে কুশল জিজ্ঞেস করল কেউবা নিজ কাজে ব্যস্ততা। তৃতীয় প্রিয়ডে মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান স্যার আমাকে নবম শ্রেণিতে নিয়ে গেলেন। পরিচয় করানোর পরে ক্লাস পরিচালনার জন্য অনুমতি দিয়ে বিদায় নিলেন।
টেবিলের উপর এক পাহাড় খাতা, মানে বাড়ির কাজ। এটা প্রধান শিক্ষিকার বাংলা প্রথমপত্র ক্লাস। আজ থেকে আমাকেই নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলো। আমি একটা খাতা হাতে নিই আর খুঁটিনাটি দেখতে থাকি। দুই-তিনটা বাড়ির কাজ দেখার পর ছাত্রীদের একজন বলল, স্যার, এইভাবে না। এখানে তিরাশিটি খাতা আছে, এইভাবে দেখলে দেখে শেষ করতে পারবেন না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে কি করব?
ওরা বলল, আপনি শুধু টিকমার্ক দিয়ে ফেরত দিন, সবাই বাড়ির কাজ আনছে কিনা সেটা দেখলেই হবে। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম, এটা কোন পদ্ধতি হতে পারে না! আমি আজকেই যোগদান করলাম, আমাকে আজকেই ক্লাসে পাঠদান করতে পাঠিয়ে দেওয়া হল! একজন নতুন শিক্ষক যোগদান করলে তাকে শ্রেণিকক্ষে পাঠানোর পূর্বে অবশ্যই শিক্ষণ-শেখানো পদ্ধতির উপর তার একটা প্রশিক্ষণ হওয়া উচিত, তবেই না সে পাঠদান করতে পারবে, এইটা শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটা দূর্বল দিক বলেই মনে হলো।
জাকিয়া ফেরদৌসী ম্যাডামের ষষ্ঠ ‘খ’ শাখার বাংলা দ্বিতীয়পত্র ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব পড়ল আমার উপর সেই সাথে অষ্টম ‘খ’ শাখার ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র।
০২ এপ্রিল শনিবার স্কুলে গেলে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান স্যারের নিকট থেকে ল্যাবের দায়িত্ব বুঝে নিলাম। দায়িত্ব বলতে ল্যাব খুলে দিল, লেনেবো ব্যান্ডের পাঁচটি ডেক্সটপ, পাঁচটি ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার, একটি প্রিন্টার ও একটি মডেম। আমি কম্পিউটার খুলেই লিখলাম, ‘দয়াল ভরসা, আল্লাহ সর্বশক্তিমান, তারিখ: ০২-০৪-২০১১ লিখে একটি ডকুমেন্টে সংরক্ষণ করলাম।
নবম-দশম শ্রেণির একটি করে মোট দুইটি কম্পিউটার ক্লাস যুক্ত হলো দায়িত্বের তালিকায়। জনাব বিরাজ কুমার ভট্টাচার্য্য স্যার দশম শ্রেণির হিসাববিজ্ঞান ক্লাস নেন আর জনাব কানিজ রাবেয়া ‘রুবি’ আপা নেন নবম শ্রেণির হিসাববিজ্ঞান ক্লাস।
সেই সময়ে ব্যবসায় শিক্ষার তিনটি বিষয় ছিল ‘হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও বাণিজ্যিক ভূগোল।’ ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক হিসাববিজ্ঞান ক্লাস নিতেন আর অন্যগুলো যে কেউ নিতে পারতো। বিরাজ স্যার আমাকে দশম শ্রেণির হিসাববিজ্ঞান ক্লাসটি উপহার দিলেন। আমিও ক্লাস নেওয়া শুরু করলাম।
ইতোমধ্যেই অন্যান্য স্যারদের সাথে বেশ সখ্যতা গড়ে উঠল, শিক্ষক মিলনায়তনে একদিন কোহিনুর আপা, ফারহাত আপা আমাকে বুঝালেন রুবি আপা যেহেতু সিনিয়র, আপনি নবম শ্রেণির হিসাববিজ্ঞান ক্লাসটা নেন আর রুবি আপাকে দশম শ্রেণির হিসাববিজ্ঞান ক্লাসটা দিয়ে দিন।
আপাদের পরামর্শে আমি নবম শ্রেণির হিসাববিজ্ঞান ক্লাস নেওয়া শুরু করলাম। একদিন শিক্ষক কমনরুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, কোহিনুর আপা এসে বললেন, চাকরি আপনার কেমন লাগে?
আমি বললাম, জ্বী, ভাল লাগে।
উনি বললেন, চাকরি করেন, ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি কোহিনুর আপাকে বললাম, একটা কথা বলি, আমি খলিল স্যারের ছাত্র। আমি আপনাদের বাসায় গিয়েছি, আল আমিন আর মুমুকেও চিনি। স্যারের ছাত্র হিসেবে আপনি আমাকে তুমি বলে ডাকলে খুশি হবো সেই সাথে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার অনুরোধ করছি। কোহিনুর আপা হাসি দিলেন। সেটা আনন্দের হাসি ছিল আমি নিশ্চিত।
পরবর্তী কার্য দিবসে এসে জানালেন আমাকে নিয়ে আমার স্যারের সাথে কথা হয়েছে, স্যারও খুব খুশি হয়েছেন। কোহিনুর আপার সাবলীল আচরণ আমার বেশ ভাল লাগল। চাকরিতে যোগদান করলাম, চাকরি করতেছি; শুনলাম মাস শেষে নাকি বেতন পাব না!
বেতন পাওয়ার জন্য আমাকে এমপিওভূক্তির আবেদন করতে হবে। এই পদ্ধতির কথা শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম।
প্রধান শিক্ষিকা অফিস সহকারী জনাব আবদুল মান্নান সাহেবকে ডেকে এমপিও'র সকল কাগজ তৈরি করে দেওয়ার জন্য অর্ডার করলেন। মান্নান স্যার বললেন, জ্বী, আচ্ছা।
শিক্ষকতার ব্যাপারে পূর্ব থেকে আমার কোন আগ্রহ বা ধারণা ছিলনা, যার কারনে এই বিষয়ে ভাল বুঝতাম না। প্রধান শিক্ষিকা চাইলেন এমপিওভূক্তির কাজটা উনি করে দিবেন, আমি বললাম, না। আমার এমপিওভূক্তির আবেদন আমি নিজে করব।
ওনি চেহারা কালো করলেন! কাকে দিয়ে করাবে তুমি?
আমি বললাম, আপা, আমাদের গ্রামের কাউছার ভাই আছে।
ওনি বললেন, ওহ---হে, ওনাকে দিয়ে করাবে? করাও।
দিন যায় এমপিও আবেদনের সময় শেষ হয়ে আসতেছে কিন্তু আমার ফাইল মান্নান স্যার তৈরি করে দেয় না। প্রতিদিন কোন না কোন অজুহাতে ঘুরায়। একদিন মেজাজ খারাপ করে ওনাকে গিয়ে ধরলাম। উনি তখন প্রধান শিক্ষিকার কক্ষে আমার ফাইলের কাজ করছিলেন,
আমি প্রশ্ন করলাম-ফাইল গুছিয়ে দিবেন নাকি দিবেন না? শিক্ষকতার চাকরিটা এখন ছেড়ে দিয়ে চলে যাব, ঢাকার চাকরিটা এখনো আমার বহাল আছে।
আমার ধমক খেয়ে মান্নান স্যার বললেন, ভাই কি করতাম বলেন, আমি সকল কাগজ রেডি করে রাখছি এখন বড় আপা সই না দিলে আমি কি করব!
আমি জিজ্ঞেস করলাম, উনি সই দেন না কেন? মান্নান স্যার কিছুটা নরম সুরে বললেন, ওনাকে সই করার জন্য টাকা দিতে হবে।
আমি অবাক হলোম এবং পুনরায় ক্ষিপ্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কত টাকা?
মান্নান স্যার মৃদু স্বরে বললেন, পাঁচ হাজার টাকা।
সদ্য ঢাকা থেকে চাকরি ছেড়ে এসে শিক্ষকতার মহান পেশায় যোগদান করলাম, আমার কাছে মনে হলে এ যেনো সৎ পেশায় অসৎ মানুষের সাথে বসবাস, সই নেওয়ার জন্যও টাকা দিতে হবে আমাকে! আমি উত্তেজিত হয়ে আরো কিছুক্ষণ হম্বিতম্বি করলাম। সিনিয়র কয়েকজন ম্যাডামের হস্তক্ষেপে শান্ত হলাম আমি।
ঢাকায় ভাল বেতনে চাকরি করে আসছি, আমার হাতে তখন প্রচুর টাকা। এই পাঁচ হাজার টাকা কোন ব্যাপার না কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে, একজনের সই নেওয়ার জন্য তাকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে?
সিনিয়র ও ভূক্তভোগী শিক্ষকগণের কল্যাণে আমি টাকা দিতে রাজী হই এবং পরের দিন হলুদ একটি খামে করে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে স্কুলে গিয়ে কোহিনুর আপার সাথে পরামর্শ করি। আপা পরামর্শ দিলেন, এখন তিন হাজার টাকা দিন, বেতন হওয়ার পরে না হয় বাকিটা দিয়েন।
মান্নান স্যারের হাতে তিন হাজার টাকা দিয়ে দিলাম। ওনি ঐদিনই কাগজপত্র বুঝিয়ে দিলেন। আমি আমার পূর্ব নির্ধারিত ব্যক্তির মাধ্যমে কাগজপত্র কুমিল্লা পাঠিয়ে দিলাম কিন্তু....
আমার কাগজপত্র জমা দিতে বড্ড দেরি হয়ে গেলো এবং এর পরের মাস থেকে আইসিটিসহ কয়েক বিষয়ে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগণের এমপিও প্রদান বন্ধ করে দিল মাউশি।
এক মাস, দুই মাস এইভাবে ঊনিশ মাস স্কুল প্রদত্ত মাত্র আটশত টাকা বেতনে চাকরি করতে হলো আমাকে!
ঊনিশতম মাসের পর যখন পুনরায় এমপিওভূক্তির কাজ শুরু হলো, প্রধান শিক্ষক আমাকে ডেকে তাঁর কক্ষে নিয়ে মোসাম্মৎ নাছিমা আক্তার নামের একজন শিক্ষকের বিএড স্কেলের ফাইল আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন, বললেন, তোমার ফাইলটি তো কাউছার ভাই কাজ করে, এইটাসহ দিয়ে দাও, আমি তোমাকে কিছু টাকা দিব।
আমি প্রধান শিক্ষিকার সাথে আমার গ্রামের জনাব আবু কাউছার ভাইয়ের নাম ব্যবহার করেছিমাত্র, প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, আমার এমপিওর ফাইল অন্য একজনকে দিয়ে প্রসেসিং করিয়েছিলাম। আমি আমার কাগজপত্রের সাথে নাছিমা আপার কাগজপত্রসহ দিলাম সেই সাথে মোট পনেরো হাজার টাকা দিলাম ফাইল প্রসেসিংয়ের জন্য। প্রধান শিক্ষিকা আমাকে এই ব্যাপারে একটি পয়সাও দেয় নাই।
৩১-০৩-২০১১ তারিখে যোগদান করে সহি-সম্পাদন বাবদ মাত্র পাঁচ হাজার টাকা আমার নিকট চেয়ে নেয়নি, চাইলে আমি আগেই দিতাম! ওনি চাইতে দেরি হলো বলেই আমার দিতেও দেরি হলো! অবশেষে ০১-১১-২০১২ সালে প্রথম এমপিওভূক্ত হলাম।
মাঝের সময়টাতে মাত্র আটশত টাকা বেতনে খেটেছি প্রতিদিন। স্কুলের প্রত্যেক শিক্ষককে খুব কাছ থেকে চেনার চেষ্টা করেছি, চিনেছি। মানুষ মাত্রই দোষ-গুণের সংমিশ্রণ। আমার সম্মানিত সহকর্মীগণও এর উর্ধ্বে ছিলেন না। এই ঊনিশ মাসের বহু কথাই বলার বাকি আছে, আশা করছি সময় করে আপনাদের সাথে এই নিয়ে রসিয়ে আলাপ করব।
সম্পাদক: জনাব সাইফুল আজিজ, কথা সাহিত্যিক
শিরোণাম: গণিতের যাদুকর কোহিনুর আপা
বুড়িচং কালী নারায়ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের টিচিং স্টাফ অত্যন্ত দক্ষ ও শক্তিশালী। পড়ালেখার মান অত্যন্ত ভাল। গুণগত শিক্ষার ক্ষেত্রে এই স্কুল অনেক এগিয়ে আছে-এইটা একাধিকবার উপজেলা প্রশাসনের মুখে শুনেছি কিন্তু একটি স্কুলের সুনাম বৃদ্ধি পায় যেইসকল কারণে তার মধ্যে একটি হচ্ছে ভাল ফলাফল। পাশেই একটি সরকারি স্কুল থাকার কারনে বুড়িচং কালী নারায়ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থা হইছে “বড় গাছের তলে অন্য গাছ বাড়ে না!” এর মতো।
কোন শিক্ষার্থী বুড়িচং আনন্দ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেলে বুড়িচং কালী নারায়ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হয়। এইটা তাদের সেকেন্ড অপশন। তার সাথে আছে এলাকার চাপ, সরকারি স্কুলে যেহেতু এলাকার লোকদের আবদারগুলো করা যায়না তাই অভিভাবকদের আবদার বা অধিকারের কারণে এই স্কুলে মাঝারি মানের শিক্ষার্থীদের সাথে এমন কিছু ছাত্রী ভর্তি হয় যারা এসএসসি পরীক্ষার পূর্বে পর্যন্ত ভালো করে রিডিং পড়তে পারেনা!
২০১১ সালের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর সপ্তম শ্রেণিতে ছাত্রী ভর্তির জন্য একটি সুপারিশ করতে হয় আমাকে। মেয়েটার নাম জুঁই। গোপনীয়তার স্বার্থে বিস্তারিত পরিচয় দিলাম না। জুঁই ০৩ বিষয় ফেল করেছে এর মধ্যে গণিতে পেয়েছে ০০। আমার সুপারিশে জুঁই সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হলো। প্রথম সাময়িক, দ্বিতীয় সাময়িক এবং বার্ষিক পরীক্ষায় জুঁই একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে সেই সাথে গণিতে ০০।
আবারো সুপারিশের জন্য অনুরোধ আসল, মেয়েটি আমার আত্মীয় না হলেও আমার ঘনিষ্ট বন্ধুর অনুরোধে আবারও সুপারিশ করলাম। শ্রেণি শিক্ষক জসিম স্যার। মজার ব্যাপার হচ্ছে সপ্তম শ্রেণির গণিতের শিক্ষকও ছিলেন কোহিনুর আপা এবং অষ্টম ‘খ’ শাখার গণিতের শিক্ষকও সেই কোহিনুর আপা। সুপারিশের শর্তে ছিল, মেয়েটির মা এসে লিখিত দিয়েছে, যদি গণিত পাশ না করে তাহলে জেএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হবে না, শিক্ষার্থী বা অভিভাবক এই ব্যাপারে কোন তদবীর করতে পারবে না।
জুঁই প্রথম সামিয়ক পরীক্ষায় গণিতে অকৃতকার্য।
দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায়ও গণিতে অকৃতকার্য।
জেএসসি ফরম পূরণের আগে একটি মডেল টেস্ট নেওয়া হতো সেই মডেল টেস্টেও জুঁই গণিতে অকৃতকার্য। তার এই ধারাবাহিক অকৃতকার্যতার কারণে জেএসসি ফরম পূরণ না করানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। শর্তের কারণে অভিভাবকও তদবির করতে আসেন না। কিন্তু স্কুলে একটি নিয়ম চালু ছিল, কোন শিক্ষার্থীর ফরম পূরণের দায়িত্ব কোন শিক্ষক দায়ভার হিসেবে নিলে তাকে ফরম পূরণের জন্য সুযোগ দেওয়া হতো। এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে আমি, জসিম স্যার আর কোহিনুর আপা বহু শিক্ষার্থীর দায়ভার নিজ মাথায় নিয়ে ফরম পূরণ করার সুযোগ করে দিয়েছি, আল্লাহপাকের ইচ্ছায় তারা সবাই সফলতার হাসি হেসেছিল।
কোহিনুর আপা বলতেন, কবির স্যার, যারা পরীক্ষা দিবে তাদের সবাই তো আর পাশ করে না, আল্লাহর নাম নিয়ে দিয়ে দিন, কপাল ভাল হলে পাশ করতেও পারে। পরে দেখতাম সত্যিই সেই শিক্ষার্থী পাশ করেছে। একবার এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় কোহিনুর আপার দায়িত্বের এক শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণ না করানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। আপা পরের দিন স্কুলে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ফরম পূরণের সময় কি আছে? আমি বললাম আছে। আপা বললেন, লিপিকে ফরম পূরণের সুযোগ করে দিন, ফেইল করলে করব। ওর জন্য যদি আমার বেতনও বন্ধ করে দেয় দিবে কিন্তু আমি তাকে ফরম পূরণ করাবো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপা কেন?
আপা বললেন, গত রাতে ঘুমাতে পারিনি, আমার মনে হচ্ছে, মেয়েটির সাথে অন্যায় করা হচ্ছে, আমি এইটা পারবনা, ওরে ফরম পূরণ করে দিন।
সেই লিপি ঐ বছর এসএসসি পরীক্ষায় ফেইল করেছিল, আমি ও কোহিনুর আপা হতাশ হয়েছি যার কারনে ওর কোন খোঁজ খবর নেওয়া হয়নি এমনকি কোন বিষয়ে ফেইল করেছে সেইটাও খবর নেইনি।
সেই লিপি একদিন ঝড়ের বেগে দৌঁড়ে স্কুলে আসল, কোহিনুর আপাকে সালাম করল, আপা আমি পাশ করছি, কবির স্যার কই?
আমি তখন মাঠের দক্ষিণে পুকুর পাড়ে দাঁড়ানো ছিলাম, লিপি দৌড়ে গিয়ে আমাকে বলল, ...ও কবির স্যার, আমি পাশ করছি।
আমি বললাম, বলো কি?
জ্বী, স্যার। শারীরিক শিক্ষায় ফেইল করেছিলাম, চ্যালেঞ্জ করেছি ফলাফল পাশ আসছে।
এইটা সেই লিপি যাকে কুহিনুর আপা গণিত পড়াতেন।
কুহিনুর আপা শিক্ষার্থীদেরকে তাদের স্তর বুঝে এমন ভাবে গণিত পড়াতেন, শিক্ষার্থী হঠাৎ করেই ভাল হয়ে যেতো না কিন্তু ধীরে ধীরে সে কৃতকার্য হতো। কোহিনুর আপা বলতেন, গণিত বুঝলে ঠিকই একদিন ভাল করবে।
জুঁই এর কথা মনে আছে আপনাদের?
হুম, সেই জুঁই ঐবছর জেএসসি পরীক্ষায় গণিতে এপ্লাস পেয়েছিল। কোহিনুর আপার পান্ডিত্য বুঝানোর জন্য এই জুঁইয়ের উদাহরণ জীবনে বহুবার দিয়েছি কিন্তু কোহিনুর আপা কি শুধু একজন জুঁই বা একজন লিপিতেই সীমাবদ্ধ? না। কখনোই না। ওনি পাঠদানের সাথে মানবিকতার ছোঁয়ায় এমন জুঁই বা লিপিকে জন্ম দিয়েছেন বার বার।
আত্মপ্রচার বিমুখ, নিভৃতচারী এই মহীয়সী নারীকে কাছ থেকে দেখেছি তেরো বছরের বেশি। পাঠদানে যেমন মায়ের মমতা মিশানো তেমনী বিষয়জ্ঞানে আছে পান্ডিত্য। স্রস্টার দয়ায় পরিবার জীবনে আছে আকাশ ছোঁয়া সফলতা।
এসএসসি পরীক্ষার পূর্বে মা মারা যাওয়া গ্রামের এক মেয়ে থেকে কোহিনুর ম্যাম হওয়ার পথটা সহজ ছিলনা কিন্তু তাঁর অদম্য পথচলা আল্লাহপাক নিজ রহমত দ্বারা সহজ করে দিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নারী জয়িতা পুরস্কারের জন্য আবেদন করতে আমন্ত্রণ জানানো হলো, আপা আবেদন করবেন না। ওনার এইসব স্বীকৃতির দরকার নেই। এই কথাটা কিভাবে যেনো আমি জানতে পারলাম, আমি আবেদন করতে আগ্রহ দেখালে আপা বলল, আমি নিজ দায়িত্বে আবেদন করেন। আপার মুখ থেকে যেটুকু জানলাম সেইটুকুর পুঁজিতে আবেদন করে দিলাম, ফলাফল আপা নারী জয়িতা হিসেবে বিজয়ী হলেন।
আগামী ২০ অক্টোবর এই মহীয়সী নারী ও মাতৃতুল্যরত্ন শিক্ষকের শেষ কর্ম দিবস, আপাকে নিয়ে ইনশাআল্লাহ আরো লিখব কিন্তু ওনার জন্য এখনই আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে...!