স্বর্গের সহযাত্রী

 স্বর্গের সহযাত্রী

০১-ময়মনসিংহের মোখলেছুর রহমান ভাইয়ের দরবার শরীফে আসার ইতিহাস 

জনাব মোখলেছুর রহমান নামে আমাদের দরবার শরীফের একজন ভক্ত আছেন যিনি ময়মনসিংহ থেকে আসেন। ২০১১-২০১২ সালের দিকে ওনার সাথে আমার পরিচয় হয়। যখন দয়াল মঞ্জিল নির্মাণের কাজ চলছিল তখন তিনি সেখানে নিজের শ্রম বিনিয়োগ করেছেন। এই সময়ে উনার সাথে সালাম বিনিময়ের বেশি কথা হতোনা।

দয়াল বাবা পর্দার করে পরে একদিন ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‍ওনি কোন প্রেক্ষাপটে দরবার শরীফে এসেছেন। উনি বললেন, গাউছেপাক হুজুরের নামে উনাদের এলাকায় একটি দরবার শরীফে উনার যাতায়াত ছিল। প্রায় বারো বছর উনি উনার ঐ পীরের খেদমতে ছিলেন কিন্তু উনার বউ এই পীর-মুরিদ বিষয়টা বুঝত না অথবা বুঝতে চাইত না।

একদিন উনার স্ত্রী বললেন, আপনাকে পীরের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধ করবনা, শর্ত হচ্ছে, আমাকে এমন কিছু আলামত দেখাতে হবে যেইটার মাধ্যমে আমি পীরকে বিশ্বাস করব এবং পীরের বাড়িতে সময় দেওয়াটা বৃথা নয় বলে ধরে নিব।

স্ত্রীর কথামতো উনি নিজ পীরকে বললেন, আমি যে এখানে আসি, আমার আসা যে বৃথা নয় এই ব্যাপারে আমার স্ত্রী প্রমাণ চায়। উনি বললেন, এই কথা বলার পর আমার পীর শুধু আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল কিন্তু কোন উত্তর দেয়নি। আমি তাঁর আচরণে বুঝতে পারলাম যে উনি কোন আলামত দেখাতে পারবে না। তখন আমার মনে হলো, হায়, তাহলে তো আমি আমার জীবনের এতোগুলো বছর হেলায় হারিয়ে ফেললাম!

উনি তারপর থেকে গাউছেপাক হুজুর (র.) এর নিকট আবেদন করলেন, হুজুর, আপনার নামের দরবার শরীফে এতোদিন ছিলাম কিন্তু এখন আমি যা বুঝলাম আমার পীর তো সত্য পীর নয়, আপনি দয়া করে আমাকে একজন সত্য পীরের সন্ধান দিন।

কোন একদিন স্বপ্নযুগে গাউছেপাক হুজুর (র.) উনাকে দেখা দিলেন এবং উনার ডান হাতের তালুতে দয়াল হুজুর কেবলার ছবি দেখালেন, নাম বললেন এবং দেশের দক্ষিণ অংশে সন্ধান করার জন্য নির্দেশ দিলেন।

গাউছেপাক হুজুরের নির্দেশমতে উনি সত্যপীরের সন্ধান করতে লাগলেন।

বুড়িচং উপজেলার শিবরামপুর গ্রামে মোখলেছুর রহমান নামে উনার একজন পরিচিত লোক ছিল যিনি তাঁর পূর্ববর্তী দরবারের সম্পর্কে পীর ভাই, তিনি একদিন ফোন দিলেন এবং বললেন, আমাদের বুড়িচংয়ে একটি মাহফিল আছে, আপনি আসুন, আপনাকে নিয়ে মাহফিলে যাবো।

পীর ভাইয়ের কথায় তিনি আসলেন এবং শিবরামপুর গ্রাম থেকে ক্ষেতের উপর দিয়ে ফাঁড়ি রোডে দয়াল হুজুরের বাড়ির দক্ষিণ দিক দিয়ে এসে বাড়ির কাছে পৌছলেন, তিনি বললেন, আমি যেই দরবার শরীফের কাছে আসছি ঠিক সেই মূহুর্তে দয়াল হুজুর বাড়ি থেকে বের হয়ে আসছেন। আমি ওনার কাছাকাছি এসে দেখলাম, গাউছেপাক হুজুর (র.) যার ছবি আমাকে দেখিয়েছিলেন, সেই ছবির লোকটিই আমার সামনে দাঁড়িয়ে।

আমি দৌড়ে গিয়ে ওনাকে কদমবুসি করলাম, আর ‍ওনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, আপনি তাহলে আসছেন? উনি এমনভাবে আমাকে প্রশ্ন করলেন, প্রশ্ন শুনে মনে হলো আমার আসার কথা উনি আগে থেকেই জানতেন, আমি সাথে সাথে জবার দিলাম, জ্বী, আমি আসছি। উনার চুলে তখন মেহেদী দেওয়া ছিল, উনি উনার মাথা থেকে কিছু মেহেদী এনে আমার হাতে লাগিয়ে দিয়ে বললেন, মাহফিলে থাকেন।

উনি বললেন, আমি তখন থেকেই মাহফিলে থাকলাম, মাহফিল শেষ করে এর পরের দিন দয়াল হুজুর থেকে বিদায় নিয়ে নিজ বাড়ি ময়মনসিংহ গেলাম। বাড়ি যাওয়ার পর আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, আপনি কোথায় গিয়েছিলেন? আমি বললাম, ক্যান? বুড়িচং গিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী আমাকে বলল, আপনি বুড়িচং গিয়ে মাহফিলে জাননি? যেখানে মাহফিল হলো উনার নাম এই...? চেহারা এইরকম, ঠিক না?

আমি প্রশ্ন করলাম, এই কথা তুমি জানো কীভাবে? আমার স্ত্রী বলল, ঐদিন রাতে স্বপ্নে দয়াল হুজুরের সাথে আমার দেখা হয় এবং তিনি আমাকে এইসকল বিষয়ে অবগত করেন।

এই লেখাটা যখন লিখছি তখন জুন ২০২৫খ্রি. আমাদের পীর ভাই মোখলেছুর রহমান আল্লাহপাকের দয়ায় এখনো বেঁচে আছেন এবং অদ্যাবধি পর্যন্ত বুড়িচং শাহীপাক দরবার শরীফের একজন মুরীদান হিসেবেই আছেন।

তথ্যসূত্র: মোখলেছুর রহমান ভাই স্বয়ং

০২-আমার এক নারী সহকর্মীর জন্য দয়াল হুজুরের নিকট দোয়া  চাওয়ার ঘটনা-

আমার একজন সিনিয়র নারী সহকর্মী আমাকে খুব আদর করতেন এবং বিশ্বাস করতেন। আমি একটি দরবারের ভক্ত এইটা ওনি জানতেন এবং মাঝে মধ্যে আমার মাধ্যমে হুজুরের নিকট দোয়ার দরখাস্ত পাঠাতেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সহকর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন মতাবলম্বী থাকলেও বিভিন্ন সময়ে অফিসে পীর-মাশায়েখ, অলি-আউলিয়া নিয়ে আমি বিভিন্ন কথা বলতাম, কোন সহকর্মী পক্ষে বলতেন আবার কেউ বিপক্ষে। আমার এই সহকর্মী সবার সামনে নিরব থাকলেও নিরবে আমাদের মধ্যে এইব্যাপারে ইতিবাচক আলোচনা হতো।

একদিন ম্যাডাম আমাকে একাকী ডেকে নিয়ে বললেন, আপনাকে ছোট ভাইয়ের মতো দেখি, আমার একটা পারিবারিক ঝামেলা আছে, আমি কি আপনার মাধ্যমে আপনার হুজুরের নিকট দোয়া চাইতে পারি? আমি উনাকে বিষয়টি খোলে বলার অনুরোধ করি, উনি আমাকে বিষয়টি বিস্তারিত বলেন-

উনি বললেন, আমার মেঝো মেয়েটার পেছনে একটা বখাটে ছেলে লেগেছিল। বিরক্ত করত। ওর ভয়ে আমরা মেয়েকে পড়ালেখা করার জন্য ঢাকা পাঠিয়ে দিয়েছি, এখন আমার ছেলে ইন্টারে ভর্তি হয়েছে, কলেজে যাবে, ঐ বখাটে ছেলেটার হাত থেকে আমার ছেলেটাকে যেনো আল্লাহপাক রক্ষা করেন সেই ব্যাপারে দোয়া চাই।

আমি ম্যাডামের নিকট বিস্তারিত  শুনে আমার পীরের নিকট গিয়ে বলি এবং সহকর্মীর পক্ষে দোয়া চাই। আমার পীর সাহেব কেবলা সব শুনে সহকর্মীর ছেলের জন্য দোয়া করলেন এবং বললেন এই বখাটে ছেলে পেছনে লেগে আছে, আল্লাহপাক চাইলে ঐ ছেলের পক্ষে আরো তিনজনকে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন, আল্লাহ ভরসা। চিন্তা করতে নিষেধ করিও।

আমি আমার সহকর্মীকে বিষয়টি বুঝিয়ে বললাম। ওনি আশ্বস্ত হলেন।

কিছুদিন পর আমার সহকর্মী এসে বললেন, স্যার, আপনার ভাগিনার নবীন বরণ অনুষ্ঠান হয়েছে। ঐ নবীন বরণ অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় কলেজ এরিয়ার একজন প্রভাবশালী ব্যাক্তির সাথে আপনার ভাগিনার দেখা হয়, ওনি তাকে নবীনবরণ অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে সবার সাথে পরিচয় করে দিয়েছে এবং তাকে যেনো সবাই দেখে রাখে সেইটা বলে দিয়ে আসছে।

আমি বললাম, আলহামদুলিল্লাহ। পুনরায় এই ঘটনা আমি আমার পীরের নিকট গিয়ে বললাম, আমার পীর সাহেব কেবলা বললেন, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহপাক ছেলেটাকে হেফাজত করেছেন।

এই ঘটনার বছর দুই পরে আমার সহকর্মী পুনরায় আমাকে বললেন, ভাই, আপনার যেই ভাগ্নিটার পেছনে বখাটে ছেলেটা লেগেছিল সেই ভাগ্নিটার জন্য একটা বিয়ে আসছে। আমরা বিয়েটা দিতে চাই কিন্তু ঐ বখাটে ছেলেটা এখনও এলাকাতেই আছে, সে যদি কোন ক্ষতি করে! আমি এখন কি করতে পারি আপনি আপনার হুজুরের সাথে একবার আলাপ করে দিবেন?

আমি আমার পীর সাহেব কেবলার নিকট গিয়ে সহকর্মীর বিষয়টি পুনরায় আলোচনা করলাম। ওনি বললেন, আমার মনে হয় বিয়েটা ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলে ভাল হবে। ওনাদেরকে বলে দাও ঢাকায় বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে।

আমি এসে আমার সহকর্মীকে বললাম, সহকর্মী বললেন, না। ঢাকায় বিয়ের অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়। আমাদের সকল আত্মীয়-স্বজন কুমিল্লায়, ছেলে যদিও ঢাকায় ব্যবসাসূত্রে সেটেল্ড কিন্তু ওর আত্মীয়-স্বজনও সবাই কুমিল্লায় তাই বিয়ের অনুষ্ঠান কুমিল্লাতেই করা লাগবে। 

আমি পুনরায় আমার পীর সাহেব কেবলাকে জানালাম। কিছুদিন পর আমার সহকর্মী এসে বললেন, স্যার, যেই বিয়েটা এসেছিল ঐটা হবে না। ক্যানসেল হয়েগেছে।

প্রায় এক মাস পর আমার সহকর্মী আমাকে বললেন, স্যার, যেই বিয়েটা ক্যানসেল হয়ে গিয়েছিল সেইটা পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা আছে তবে, ছেলের পক্ষের শর্ত হচ্ছে, বিয়ের অনুষ্ঠান ঢাকায় হতে হবে। আমি বললাম, ম্যাডাম, আমার পীরের চাওয়াও কিন্তা এটাই ছিল যে, বিয়েটা ঢাকায় হউক। আমি আমার পীরকে গিয়ে পুনরায় ঘটনাটি জানালাম, ওনি বললেন, আল্লাহপাক চাইলে সব সম্ভব, আল্লাহ ভরসা।

২০১৬ সালের ২৯ তারিখ শুক্রবার দিন ঢাকায় ওনার মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ওনি সময় সুযোগ করে আমাকে তথ্য দিতেন আমি এই তথ্য আমার পীরকে দিয়ে দোয়া চাইতাম। পরে ম্যাডাম বললেন, স্যার, ওনারা বউভাত খেতে কুমিল্লায় আসবে, তখন যদি কোন সমস্যা হয়? আমি শুক্রবার দিন রাতে আমার পীর সাহেব কেবলার সাথে কথা বললাম এবং কুমিল্লায় বউভাত অনুষ্ঠান করার অনুমতি দিলেন। শনিবার বা রবিবার দিনে বউভাত অনুষ্ঠানের পর ম্যাডাম আমাকে জানিয়েছেন, ঐ বখাটে ছেলে ম্যাডামের ছেলের সাথে সাক্ষাৎ হলেও কোন সমস্যা করেনি।

ম্যাডামের ছেলে এবং মেয়ে দুজনেই বাখাটে মুক্ত জীবন-যাপন করছেন, আলহামদুলিল্লাহ।

তথ্যসূত্র: দয়াল মোর্শেদ কেবলা শরীয়তে পর্দা করার আগের দিনের ঘটনা। স্বাক্ষী লেখক নিজে।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url